উত্তরের আলো

রুয়েটে ক্যাশলেস ক্যাম্পাসের পথে আরও একধাপ

রুয়েটে ক্যাশলেস ক্যাম্পাসের পথে আরও একধাপ

শেখ সিয়াম আব্দুল্লাহ,রুয়েট প্রতিনিধি:শিক্ষার্থীদের আবাসিক জীবনকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘ইন্টিগ্রেটেড হল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’ চালু করেছে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)। ওয়েবভিত্তিক এ সমন্বিত অটোমেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে আবাসিক হলের ফি প্রদান, বকেয়া ব্যবস্থাপনা, ডাইনিং কার্যক্রম, সিট বরাদ্দ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মচারীদের বেতন, অভিযোগ গ্রহণ ও নোটিশসহ বিভিন্ন সেবা একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হচ্ছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সফটওয়্যারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেনসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমানে রুয়েটের আবাসিক হলগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রম মূলত ম্যানুয়াল ও কাগজভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। হল ফি প্রদান, বকেয়া হিসাব, ডাইনিং কুপন, সম্পদের হিসাব সংরক্ষণ এবং কর্মচারীদের বেতন প্রস্তুত ও পরিশোধের মতো কাজগুলোতে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে ফি পরিশোধের জন্য দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং নগদ অর্থের লেনদেন ও হিসাব সংরক্ষণে সময়ক্ষেপণ ছিল অন্যতম সমস্যা। এসব জটিলতা কমিয়ে আনতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমন্বিত ডিজিটাল এ ব্যবস্থাটি চালু করেছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সফটওয়্যারটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে রুয়েট আইসিটি সেলের পরিচালক ড. মো. সামিউল হাবিব বলেন, কোনো ধরনের আউটসোর্সিং ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ইন-হাউস প্রযুক্তিতে স্টুডেন্ট পোর্টালটি তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে মেল হল-১ এ সফটওয়্যারটির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহ পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার ও ব্যবহারকারীদের মতামত পর্যালোচনার পর এটি পর্যায়ক্রমে পুরো ক্যাম্পাসে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ম্যানুয়ালি ডাইনিং কুপন সংগ্রহের ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি অনলাইনে হল ফি পরিশোধ, নোটিশ গ্রহণ এবং ব্যাংকে দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়ানো ছাড়াই পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণের সুযোগ পাবেন।

নতুন সফটওয়্যারের মাধ্যমে হলসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের ফি অনলাইনে পরিশোধ করা যাবে। স্টুডেন্ট পোর্টালের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হল ফি, সিট ভাড়া, ডাইনিং চার্জ ও অন্যান্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে পারবেন। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবা, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকবে। পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানি রিসিট তৈরি হবে এবং প্রতিটি লেনদেনের যাচাইযোগ্য তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে।

সফটওয়্যারটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বকেয়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কোর্স রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার সমন্বয়। কোনো শিক্ষার্থীর হলে বকেয়া থাকলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা শনাক্ত করবে এবং বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত কোর্স রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা যাবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সামনে সরাসরি পেমেন্ট লিংকও প্রদর্শিত হবে। তবে বিশেষ ও যৌক্তিক পরিস্থিতিতে প্রভোস্ট শর্তসাপেক্ষে সময় বৃদ্ধি বা ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফি পরিশোধ না করলে প্রতি মাসে ৫০ টাকা করে জরিমানাও যুক্ত হবে।

ডাইনিং ব্যবস্থাপনাতেও এ সফটওয়্যার আনবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। প্রচলিত কাগজের কুপনের পরিবর্তে চালু হবে ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ রিচার্জ করে আগের দিন থেকেই অনলাইনে খাবারের টোকেন সংগ্রহ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ে ডাইনিংয়ে স্থাপিত আরএফআইডি মেশিনে কার্ড স্ক্যানের মাধ্যমে টোকেন যাচাই করে খাবার গ্রহণ করা যাবে। প্রয়োজনে হল কেয়ারটেকারের মাধ্যমে অথবা বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করেও কার্ডে অর্থ রিচার্জের সুবিধা থাকবে।

কেন্দ্রীয় সার্ভারভিত্তিক ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থার ফলে একটি টোকেন পুনরায় ব্যবহার, নকল বা অন্যের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে ডাইনিংয়ে বিক্রি হওয়া ও ব্যবহৃত খাবারের তথ্য সংরক্ষিত থাকায় প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করা সহজ হবে। এতে খাদ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি ডাইনিং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হবে।

সফটওয়্যারটিতে প্রভোস্টদের জন্য থাকবে পৃথক ড্যাশবোর্ড ও সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা সুবিধা। হলের আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, জেনারেটর, রান্নাঘরের বিভিন্ন উপকরণসহ সব ধরনের সম্পদের ডিজিটাল ইনভেন্টরি সংরক্ষণ করা যাবে। সম্পদের বিবরণ, পরিমাণ, ক্রয়ের তারিখ, মূল্য, বর্তমান অবস্থা ও অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কোনো সরঞ্জাম মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে অনলাইনে সার্ভিস রিকোয়েস্ট পাঠানো এবং তার অগ্রগতি অনুসরণ করার সুবিধাও থাকবে।

এ ছাড়া স্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরত হল কর্মচারীদের তথ্য, হাজিরা, ছুটি এবং বেতন ব্যবস্থাপনাও সফটওয়্যারের আওতায় আনা হবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন হিসাব, মাসিক পে-বিল ও পে-স্লিপ তৈরির পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি বেতন পরিশোধের সুযোগ থাকবে। এর ফলে বেতন প্রস্তুতিতে সময় কমার পাশাপাশি হিসাব সংরক্ষণ আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ হবে।

শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দ ও হল পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সফটওয়্যারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মেধা বা বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত অন্যান্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে অনলাইনে সিট ও কক্ষ বরাদ্দ, খালি সিটের তথ্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হল পরিবর্তনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা যাবে।

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্রোফাইলও তৈরি হবে। সেখানে আবাসিক তথ্য, ফি, শৃঙ্খলা ও অভিযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য একত্রে সংরক্ষিত থাকবে। শিক্ষার্থীরা কক্ষ নম্বর উল্লেখ করে অনলাইনে অভিযোগ বা রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত আবেদন করতে পারবেন এবং আবেদনটির অগ্রগতি ও সমাধানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

হলের সব ধরনের অফিসিয়াল নোটিশও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রভোস্ট বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নোটিশ সরাসরি মোবাইল নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাবে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার ক্ষেত্রে প্রচলিত নোটিশ বোর্ডের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমবে।

এ ছাড়া সফটওয়্যারটির মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনে তাঁর অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ অন্য শিক্ষার্থীর অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, প্রভোস্ট, হল অফিস, হিসাব বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন তৈরির সুবিধাও রাখা হয়েছে। ব্যবহারকারীর দায়িত্ব ও প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক অ্যাকসেস কন্ট্রোল থাকায় শিক্ষার্থী, হল কর্মচারী, ডাইনিং ম্যানেজার, সহকারী প্রভোস্ট, প্রভোস্ট, হিসাব বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অনুমতি নির্ধারণ করা যাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত এ সফটওয়্যার চালুর ফলে আবাসিক হল ব্যবস্থাপনায় ম্যানুয়াল লেজার, কাগজের কুপন ও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব আবাসিক হলের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত চিত্র পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে। অডিটের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ সহজ হওয়ার পাশাপাশি বাজেট ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণও আরও কার্যকর হবে।

সামগ্রিকভাবে এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাউন্টারে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি কমার পাশাপাশি হল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। প্রযুক্তিনির্ভর এ সমন্বিত ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার চালুর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস ও স্মার্ট ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার: