উত্তরের আলো

বাংলাদেশের গর্ব রুনা খান পেলেন র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার

বাংলাদেশের গর্ব রুনা খান পেলেন র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও ‘এশিয়ার নোবেল’খ্যাত র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার-২০২৬ পেয়েছেন বাংলাদেশের সমাজকর্মী, ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। প্রান্তিক, নদীভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় র‍্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন ২০২৬ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। এ বছর রুনা খানের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক ও আইনবিদ টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো কিয়ি এ পুরস্কার পেয়েছেন। আগামী ১৫ নভেম্বর ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

দুর্গম মানুষের পাশে ‘ফ্রেন্ডশিপ’

দুর্গম চরাঞ্চল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামাজিক অধিকার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০০২ সালে রুনা খান ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠা করেন। যমুনা নদীর দুর্গম চরে বসবাসকারী মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ভাসমান ও স্থলভিত্তিক হাসপাতাল, মোবাইল ক্লিনিক, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জীবিকা উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে।

ফ্রেন্ডশিপের রয়েছে সাতটি হাসপাতাল জাহাজ, দুটি স্থলভিত্তিক হাসপাতাল এবং প্রায় ৫৫০টি মোবাইল ক্লিনিক। স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৭০০ প্রশিক্ষিত কমিউনিটি মেডিক সহকারী। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির আওতায় সৌরগ্রাম প্রতিষ্ঠা, ম্যানগ্রোভ বনায়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিসহ বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা পেয়ে থাকেন।

যে কারণে রুনা খানকে স্বীকৃতি

র‍্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, বাংলাদেশের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ দেখে রুনা খান তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে ফ্রেন্ডশিপ গড়ে তোলেন। একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ পরবর্তীতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, জীবিকা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি সমন্বিত উন্নয়ন মডেলে পরিণত হয়েছে।

ফাউন্ডেশন রুনা খানের দরিদ্র মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা, সাহস, দূরদর্শিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ২০২৬ সালের পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেছে।

পুরস্কার পাওয়ার পর রুনা খান আনন্দ ও বিনয়ের সঙ্গে এ স্বীকৃতি গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, কোনো নেতা একা পথ চলেন না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ফ্রেন্ডশিপ পরিবারের নিরলস প্রচেষ্টার প্রতি এ পুরস্কার উৎসর্গ করেন তিনি।

বাংলাদেশের জন্য গৌরবের অর্জন

রুনা খানের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গৌরবের। এর আগে ১৯৮৫ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়েছিলেন। ফলে রুনা খান এ পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের আরেকজন বিশিষ্ট সমাজসেবী হিসেবে দেশের আন্তর্জাতিক সম্মান আরও উজ্জ্বল করলেন।

র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট র‍্যামন ম্যাগসেসের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫৮ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এশিয়ায় জনসেবা, নেতৃত্ব ও মানবিক অবদানের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে চিকিৎসা ও শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মানুষের জীবিকা উন্নয়নে রুনা খানের দীর্ঘ দুই দশকের কাজ এবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সম্ভাবনাকেও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।

শেয়ার: