রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ , ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ১৮ এপ্রিল। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম বড়াইবাড়ীর জন্য দিনটি শুধুই একটি তারিখ নয়—এটি সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের এক রক্তাক্ত স্মৃতি।
২০০১ সালের এই দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১০৬৭/৩ পিলার অতিক্রম করে বড়াইবাড়ী বিওপি বিজিবি ক্যাম্প ও গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়। সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্য ও গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
সংঘর্ষে শহীদ হন তিন বীর সেনা সদস্য—ল্যান্স নায়েক ওহিদুজ্জামান, সিপাহী মাহফুজার রহমান এবং সিপাহী আব্দুল কাদের। আহত হন আরও কয়েকজন বিডিআর সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা। প্রতিরোধের মুখে ১৬ জন বিএসএফ সদস্য নিহত হয় বলে জানা যায়।
সেই ভোরে বড়াইবাড়ী গ্রাম ছিল ইরি-বোরো ধানের মৌসুমের ব্যস্ততায় মুখর। কৃষকেরা মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই সীমান্ত পেরিয়ে বিএসএফ সদস্যরা গ্রামে প্রবেশ করে হামলা চালায়। মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়ে গুলির শব্দ, আগুন আর আতঙ্কে।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে পুড়ে যায় অন্তত ৬৯টি ঘরবাড়ি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি টাকা। নারী-শিশুর আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে সীমান্তের বাতাস।
হামলার খবর পেয়ে বিডিআর সদস্যরা দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান গ্রামবাসীরাও। সেদিনের প্রতিরোধ ছিল শুধু সামরিক জবাব নয়, মাতৃভূমি রক্ষার অদম্য অঙ্গীকার।
হাবিলদার আব্দুল গনি, নায়েক নজরুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক আবু বক্কর সিদ্দিক, সিপাহী হাবিবুর রহমান ও সিপাহী জাহিদুর নবীসহ অনেকে আহত হন। স্থানীয়দের মধ্যেও ছিলেন আহতের সংখ্যা কম নয়—ছবিরন বেওয়া (৮০) ও মোস্তফা মুন্সি (৪৫)সহ আরও অনেকে সেদিন রক্তাক্ত হন।
এলাকাবাসীর ধারণা, সিলেটের পাদুয়ায় পূর্ববর্তী সংঘর্ষের প্রতিশোধ নিতেই বড়াইবাড়ীতে এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল। তবে যেকোনো বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে উঠে বড়াইবাড়ীর মানুষ আজও মনে রাখে তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ইতিহাস।
ঘটনার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাজা। বর্তমানে দুই শতাধিক পরিবার গ্রামটিতে বসবাস করছে। সরকার, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় তারা বসবাসের সুযোগ পেলেও মানসিক ক্ষত এখনো রয়ে গেছে।
কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন,
“২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গ্রামবাসীরাও এতে অংশ নেয়। আমাদের তিনজন বিডিআর সদস্য শহীদ হন। শহীদদের স্মরণে প্রতিবছর মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয় এবং একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।”
প্রতিবছর ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ীতে মিলাদ, দোয়া ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। তবে এলাকাবাসীর দাবি—এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হোক।
বড়াইবাড়ীর ইতিহাস শুধু একটি সীমান্ত সংঘর্ষের কাহিনি নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। রক্তে লেখা সেই দিনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—বাংলার মাটি রক্ষায় এ দেশের মানুষ কখনও পিছপা হয়নি, হবেও না।











