চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: ১৮ জুলাই ২০২৬ , ২:৪৯ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙন থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারী ইউনিয়নকে স্থায়ীভাবে রক্ষার দাবিতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত কার্যকর নদীশাসন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং চরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে পৃথক চরবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল ১১টায় চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল খেয়াঘাটসংলগ্ন নদীভাঙন এলাকায় জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে সহস্রাধিক নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু। বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিলমারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারী সরকার, জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শরীফ উদ্দিন আহমেদ রিন্টু, চিলমারী উপজেলা শাখার সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আবু হানিফা, সদস্যসচিব সহকারী অধ্যাপক ফজলুল হক, সোনালী অতীত ফুটবল ক্লাব কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদ আলী ঝিনুক, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম কাজী, মহিলা নেত্রী শাহনাজ সুলতানা এবং নদীভাঙনের শিকার আছির উদ্দিন ও শাহজাহান আলী।
বক্তারা বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিবছর চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা হারিয়ে হাজারো মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সমাবেশে জানানো হয়, গত তিন বছরে চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতী, মনতোলা, চড়ুয়াপাড়া, তেলিপাড়া, বিশারপাড়া ও কড়াইবরিশাল গ্রামের অন্তত ১ হাজার ৫৫০টি পরিবারের বসতভিটা ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বহু পরিবার একাধিকবার বসতি স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই এখন খোলা আকাশের নিচে কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর অন্তত ৪২টি স্থানে বর্তমানে নদীভাঙন চলছে। গত ১০ বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ তাঁদের বসতভিটা হারিয়ে নতুন ঠিকানায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঠিক পরিসংখ্যান কোনো সরকারি দপ্তরের কাছে নেই।
তিনি বলেন, নদীভাঙনের শিকার মানুষ শুধু জমি বা ঘরবাড়িই হারান না; হারিয়ে ফেলেন তাঁদের শৈশব, স্মৃতি, সামাজিক বন্ধন ও জীবিকার ভিত্তিও। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো তেমন কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু আরও বলেন, দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলার দুই কোটিরও বেশি মানুষ নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের নানা সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন। তাই পার্বত্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে একটি পৃথক চরবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন সময়ের দাবি।
সমাবেশ থেকে বক্তারা অবিলম্বে চিলমারী ইউনিয়ন রক্ষায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং চরাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। বক্তাদের ভাষ্য, চরের মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনমান নিশ্চিত না হলে দেশের টেকসই উন্নয়নও পূর্ণতা পাবে না।











