শিক্ষা

এমপিও বঞ্চিত ৪২ বছর, ঈদের আনন্দ নেই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী শিক্ষক পরিবারে

  স্টাফ রিপোর্টার: ২৭ মে ২০২৬ , ১০:৫৪ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

দিন যায়, মাস আসে, বছর পেরিয়ে সরকার বদলায়; কিন্তু বদলায় না দেশের সবচেয়ে অবহেলিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকদের ভাগ্য। অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্য দিয়েই কেটে গেছে ৪২ বছর। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো শিক্ষক।
রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা। চারদিকে ঈদের আনন্দ-উৎসবের আমেজ থাকলেও ব্যতিক্রম স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক পরিবারগুলো। নেই নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য, নেই কোরবানির আয়োজন। বৈষম্যের এই অবসান কবে— এমন প্রশ্ন এখন হাজারো শিক্ষক পরিবারের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধনপ্রাপ্ত ও সরকারি অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সংখ্যা ১ হাজার ৫১৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ৩ হাজার ৩০০ টাকা হারে অনুদান পান। এছাড়া আরও প্রায় ৬ হাজারের বেশি মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলো কোনো অনুদানই পায় না।
শিক্ষকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। বিভিন্ন সরকার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্দোলনের মুখে অনলাইনে এমপিও আবেদন গ্রহণ করে এবং যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করলেও ১০ মাসেও কোনো গেজেট প্রকাশ হয়নি। এর প্রতিবাদে গত ছয় দিন ধরে শিক্ষকরা ঢাকায় অবস্থান ধর্মঘট পালন করছেন।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মীরের বাড়ি ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক সোলাইমান আলী বলেন, “সরকার ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে এমপিও বঞ্চিত। সামান্য এই অনুদান দিয়ে সংসার চালানো তো দূরের কথা, ঈদের বাজার করাও অসম্ভব।”
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ হাজীপুর বদরুল উলুম স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম এবং রংপুর সদর উপজেলার পশ্চিম খারুয়াবাধা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সরকারি নিয়ম মেনেই পাঠদান হয়। সরকার বই দেয়, উপবৃত্তি দেয়, বৃত্তি পরীক্ষাও হয়; কিন্তু শিক্ষকদের বেতনভাতা নিশ্চিত করা হয় না।”
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক সাহেবুল ইসলাম মজনু মণ্ডল বলেন, “সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু আমরা শুধু আশ্বাসই পাই। ঈদের সময় সন্তানদের জন্য নতুন কাপড় কিনতেও পারি না।”
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার উত্তর চাঁদখানা ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুল গণি বলেন, “এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা ঈদ বোনাস ও উৎসব ভাতা পেলেও আমরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।”
কুড়িগ্রাম সদরের হলোখানা কেরামতিয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক গোলাম আজম বলেন, “অনলাইনে আবেদনকৃত ও যাচাইকৃত মাদ্রাসাগুলোর দ্রুত এমপিও গেজেট প্রকাশ করতে হবে। এ দাবিতে আমরা ঢাকায় আন্দোলন করছি। প্রয়োজনে ঈদের দিনও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঈদ বর্জন কর্মসূচি পালন করবো।”
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব শামসুল আলম বলেন, “২০১৩ সালে সরকার ২৬ হাজার ১৯টি নিবন্ধনপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করলেও একটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাও জাতীয়করণ বা এমপিওভুক্ত করা হয়নি।”
এ বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইবাদত হোসেন বলেন, “বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১ হাজার ৯০টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে এমপিও দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে ২৫০টি মাদ্রাসার তালিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে বর্তমানে এমপিও ও জাতীয়করণের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।”
শিক্ষক নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। তাদের আশা, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে হাজারো শিক্ষক পরিবারের মুখে আবারও হাসি ফিরবে।