উত্তরের আলো

লালনচর্চার নতুন ঠিকানা ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়

লালনচর্চার নতুন ঠিকানা ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়

আতাউর রহমান বিপ্লব, কুড়িগ্রাম:লালন স্মরণোৎসব ঘিরে কুষ্টিয়ায় যখন ভক্ত-সাধুদের সমাগম, তখন উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে শিশুদের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর মানবতার গান। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে নয়টি গুরুগৃহ গড়ে তুলেছে লোকসংস্কৃতিচর্চার নতুন পরিসর।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে লালনভক্তদের মিলনমেলা বসেছে। গান, সাধুসঙ্গ ও স্মরণানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত হচ্ছে মরমি সাধক ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। তবে লালনচর্চা এখন আর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকার প্রত্যন্ত জনপদেও তাঁর গান ছড়িয়ে দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের গ্রামে গ্রামে শিশুদের কণ্ঠে বেঁচে উঠছে লালনের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের সিংহীমারী গ্রামের সেবালয় গুরুগৃহে দেখা যায়, একতারা ও দোতরা হাতে লালনগীতি অনুশীলন করছে শিশুরা। গানের সুরের সঙ্গে তারা শিখছে গানের অন্তর্নিহিত দর্শনও।

গুরুগৃহের প্রধান গুরু নারায়ণ রায় বলেন, লোকগানের নিয়মিত চর্চা শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখে। গানের কথা ও অর্থ বুঝিয়ে শেখালে সংগীতচর্চার পাশাপাশি তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধও গড়ে ওঠে।

একই চিত্র সাহসালয়, মায়ালয়, সান্ত্বনালয়, সুরালয়, সহজালয়, কর্মলয়, স্মৃতিলয় ও আপনালয় গুরুগৃহেও। সেখানে শিশুরা শিখছে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানো। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি তারা চর্চা করছে লালনগীতি, বাউল, মুর্শিদি, মারফতি ও ভাওয়াইয়া গান। পাশাপাশি শিখছে বেহালা, একতারা, দোতরা, সারিন্দা, তবলা, বাঁশি ও খমকের মতো লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানো।

এই উদ্যোগের নাম ‘মায়ের তরী’। নরওয়ের কবি, লেখক ও লোকগবেষক উয়েরা সেথে দীর্ঘদিনের লোকসংস্কৃতিচর্চা এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে ২০১৬ সালে স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের নিয়ে সংগঠনটি গড়ে তোলেন। বাংলার লোকসংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করে একটি বই প্রকাশ করেছেন।

মায়ের তরীর নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, সংগঠনটির লক্ষ্য লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। বর্তমানে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের নয়টি গুরুগৃহে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের চর্চা চলছে।

মায়ের তরীর অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, লালনের দর্শনকে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর মানবিক বাণীর পূর্ণ বিস্তার ঘটে না। নদীভাঙন ও বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদের শিশুদের কণ্ঠে সেই গান পৌঁছে দেওয়া মানে লালনের দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।

কুড়িগ্রাম লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক শিবলী সাদিক আতিকের মতে, লালনের গান কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি বাঙালির মানবিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।

কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজার রহমান টিউটরও মনে করেন, প্রান্তিক জনপদে লোকসংস্কৃতির এমন চর্চা জাতীয় পর্যায়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মায়ের তরী লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলে লোকঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এই ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে লোকশিল্পীদের জন্য আনন্দাশ্রম বা আনন্দলয় প্রতিষ্ঠা, হারিয়ে যাওয়া গান ও শিল্পীদের জীবনকথা সংরক্ষণে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি এবং একটি লোকসংগীত ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণোৎসব তাঁর সাধনা ও দর্শনকে স্মরণ করার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। অন্যদিকে, ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়ে মায়ের তরীর গুরুগৃহগুলো সেই দর্শনকে নতুন প্রজন্মের চর্চায় বাঁচিয়ে রাখছে। আখড়াবাড়ি থেকে নদীঘেরা জনপদে লালনের মানবতার গান এভাবেই খুঁজে নিচ্ছে নতুন ঠিকানা।

শেয়ার: