ইরিন জামান খান প্রান্তি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৭:৪৭ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
‘ভাষা’ নিতান্তই একটি শব্দ নয়; একটি আবেগ, এক অদেখা স্নেহ, অব্যক্ত ভালোবাসার নাম ভাষা। যেকোনো জাতির কাছে তার নিজেস্ব ভাষা অমূল্য। আমার বাঙালি, আমাদের কাছে আমারদের বাংলা ভাষার কোনো বিকল্প নেই, নেই কোনো বিনিময় মূল্য। কারণ বাঙালি নিজের মাতৃভাষা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বাণিজ্য করে না।
আপোষহীন মনোভাব, রক্তাক্ত রাজপথ আর প্রাণের বলিদানে আজ বাংলা ভাষা বেঁচে আছে, বেঁচে আছে কোটি প্রাণের স্পন্দনে।
বাঙালির ভাষা আন্দোলনের আদ্যপান্ত:
সালটা ১৯৪৮ সবে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুটি দেশ হিসাবে পারিচিতি পেয়েছে। ধর্মকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দুটি এদেশের পাকিস্তান অংশে যুক্ত হয় আজকের বাংলাদেশ, তখন নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান এবং অন্য অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তান।
দেশ ভাগের মাত্র এক বছরের মাথায় বাঙালি জাতির ভাষার উপর আক্রমণ করে পশ্চিম পাকিস্তান। পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জন সভায় এবং ২৪ শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেন -” উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা। ”
বাংলা ভাষাভাষী জনগণের উপর উর্দুকে এমন ভাবে আরোপ করার প্রতিবাদে সমাবর্তনে উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীরা জোরালো প্রতিবাদ জানান। ৪৮’এ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব থেকে শুরু করে ৫২’এর চূড়ান্ত বিস্ফোরণ পর্যন্ত পুরো সময় টাই ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের। ভাষা রক্ষার এ আন্দোলনের তীব্রতা রুখে দিতে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি( বাংলা ৮ ই ফাল্গুন) তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেন।
কিন্তু, অকূতভয়ী বাঙালি ছাত্র ও সাধারণ মানুষ এই ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে বের হয়, তখনই রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস।
মিছিলে তৎকালীন সরকার প্রধানের অনুমতিক্রমে নির্বিচারে গুলি করা হয়, সবে গাছে ফোটা শিমুল ফুলের ন্যায় শহীদের রক্তে লালিমা ধারণ করে ঢাকার রাজপথ। শহীদ হয় সালাম, বরকত রফিক, জব্বার, শফিউরেরা।
এরপরেই ১৯৫৬ সালে রচিত পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা প্রদান করাতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কতৃক ‘২১ শে ফেব্রুয়ারিককে’ আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে বাঙালির এই ভাষা আন্দোলন বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষের নিজেস্ব ভাষাকে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
৭৪ বছরে কেমন আছে বাংলা ভাষা?
সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তন এক চিরন্তন সত্য। বাংলা ভাষায়ও সেই নিয়মে পরিবর্তন এসেছে, এসেছে অন্যান্য ভাষার ছোঁয়া, ব্যবহারও। বাস্তবিক অর্থে কিছুটা বিমর্ষ অবস্থায় আছে বাংলা ভাষা। এখন পরিপূর্ণ শুদ্ধ বাংলা চর্চা আর দেখা যায় না। বাংলায় নিয়মিতই সংযোজিত হচ্ছে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ইত্যাদি ভাষা। এসবের একমাত্র কারণ পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তাননের জনপ্রিয় ধারাবাহিকতা নাটক, সিনেমা ও গানের বাংলাদেশ অধিক প্রচলন পাওয়া। যার ফলে সহজেই ঐসব ভাষা বাঙালি আত্মস্থ করছে, করছে নিত্যদিনের কথোপকথনে ব্যবহার; ফলে বাংলা ভাষার কদর ও চর্চা কমছে লক্ষ্যণীয়ভাবে।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন ও রক্ষা সম্পর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন- ” ভাষা সর্বদা পরিবর্তনশীল। চর্যাপদের হাত ধরে বাংলা ভাষা শুরু হওয়ার পরপর ইসলাম আসে, একই সাথে ব্রক্ষ্মণ্যবাদের একটা প্রভাব দেখা যায়।
মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, সুফি সহিত্য ইত্যাদি মিলিয়ে ১৯ শতকে বাংলা ভাষার একটা বিশিষ্ট রূপ গড়ে উঠেছিল ।
এর পরবর্তীতে ইংরেজ শাসনের সূচনা হলে আরেক রকমের বাংলা ভাষার প্রচলন হয়, যেখানে সংস্কৃতের প্রাধান্য, ইংরেজি গ্রামারের মত করে ব্যকরণ লেখার প্রাধান্য বেশি ছিল।
কলকাতায় তৈরি হওয়া বাংলা ভাষার সাথে মুসলমান বাংলা ভাষার একটা দূরত্ব ছিল। ৫২’ আন্দোলন, বাংলাদেশ গঠন হওয়ার পর যে পর্যায়ের বাংলা ভাষার নতুন চিন্তা ভাবনা দরকার ছিল তা হয় নি।ফলে কলকাতার বাংলা ভাষাকেই আমরা কপি হিসেবে নিয়েছিলাম।
এছাড়াও তিনি বলেন- জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার জন্য ভাষাগত পার্থক্য ও ভিন্ন ভাষা কাঠামো প্রয়োজন, যেমনটা ইংরেজি ভাষায় লক্ষ্যণীয় (ব্রিটিশ ও আমেরিকান ইংরেজি)।
বাংলা ভাসা রক্ষার ব্যাপারে তিনি আরও বলেন- জাতীয় সত্ত্বার কথা ভেবে বাংলা ভষার চর্চা ও অবহেলার জায়গাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া দরকার এবং জাতীয় সত্তা গড়ে তোলার সাথে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার।”
বাংলা ভাষা সঠিক ব্যবহার ও গুরুত্বের প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মাহামুদুল হাসান হামীম বলে- ” বাংলা ভাষা গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিহার্য। নিজেস্ব ভাষা হারানোর অর্থ কোনো জাতির স্বকীয়তা হারানো। আর সে ভাষা যদি হয় বাংলা ভাষা, যার সাথে রক্তাক্ত এক ইতিহাস জড়িত; তবে তা বাঙালি হিসাবে আমাদের জন্য সত্যিই লজ্জাজনক।”
হামীম আরও বলে- বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষায়, বাংলাকে অমলিন ও উজ্জীবিত রাখতে আমাদের সকলের বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহারে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।”
বাংলা ভাষা রক্ষায় করণীয় :
কথায় আছে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। আজ বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা লক্ষ্যণীয়। বাংলা বাঙালির রাষ্ট্রভাষা তো হয়েছে ঠিকই; তবে বাংলার অস্তিত্ব রক্ষায় যেন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে মা ও পরিবারের ভাষা চর্চার প্রতি বেশি মনেযোগ দিতে হবে। কারণ জন্মের পর একটি শিশু সবচেয়ে বেশি সময় তার মা ও পরিবারের কাটায়। পরিবারের সকলের মধ্যে শুদ্ধ বাংলা চর্চা ও ব্যাবহারের প্রচলন একটি শিশুর বাংলাকে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলে।
এরপরেই আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় একটা সময় পার হয়। যে মাধ্যমেরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক না কেন বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার সকল প্রতিষ্ঠানকেই হতে হবে নমনীয় ও উদার।
নিজের ভাষার প্রতি সম্মান রাখতে হবে, গর্বের সাথে বাংলার ব্যবহার করতে হবে জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে। তবেই ধীরে ধীরে বিমর্ষতার রূপ কাটিয়ে সজীব হয়ে উঠবে বাংলা ভাষায়। প্রাণের বলিদানে অর্জিত এ ভাষা এভাবেই সার্থকতা পাবে।
ইরিন জামান খান প্রান্তি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২০.০২.২০২৬





