বিবিধ

অষ্টমী স্নানে ব্রহ্মপুত্র তীরে লাখো ভক্তের ঢল

  চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: ২৬ মার্চ ২০২৬ , ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

গভীর বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার অনন্য প্রকাশে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদ-এর বালুচরে অনুষ্ঠিত হলো পবিত্র ‘অষ্টমী স্নান’ উৎসব। এ উপলক্ষে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগমে নদীতীর রূপ নেয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই নদীবিধৌত এলাকা পরিণত হয় মানুষের ঢলে। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অসংখ্য তীর্থযাত্রী রাণীগঞ্জ, নয়ারহাট, থানাহাট, রমনা ও অষ্টমী চরসহ চিলমারীর বিভিন্ন ইউনিয়নের চরাঞ্চলে ভিড় জমান। চারদিকে ভেসে ওঠে ভক্তিমূলক সঙ্গীত, প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক আবহ।
পবিত্র এই আচার নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসন রমনা ঘাট,জোড়গাছ বাজার,বলাবাড়ি হাট, রাণীগঞ্জ হাট ও ফকিরের হাটে নির্ধারিত স্নানঘাটের ব্যবস্থা করে। এতে ভক্তরা শৃঙ্খলার সঙ্গে স্নান সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ‘অষ্টমী স্নান’, যা ‘পুণ্য স্নান’ নামেও পরিচিত, কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং আত্মার পরিশুদ্ধির প্রতীকী আধ্যাত্মিক সাধনা। ভক্তদের বিশ্বাস, এই পুণ্য তিথিতে ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র জলে স্নান করলে পাপ মোচন হয় এবং লাভ হয় ঈশ্বরের আশীর্বাদ, মানসিক শান্তি ও আত্মিক প্রশান্তি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তীর্থযাত্রীরা এ উৎসবে অংশ নিতে আসেন। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলা মাস চৈত্র বা বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে আয়োজিত প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন এই উৎসব এ অঞ্চলের ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে আগের বছরের তুলনায় এবার বিদেশি ভক্তদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। অতীতে প্রতিবেশী ভারত ও নেপাল থেকেও বহু তীর্থযাত্রী অংশ নিতেন, যা এ উৎসবের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলত।
রংপুরের চৌধুরানী এলাকার ৭০ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র দাস, যিনি শৈশব থেকেই এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন, এবারও স্ত্রী সবিত্রী দাস ও ছেলে প্রিয়ানাথ দাসকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন,
“এই পবিত্র দিনে ব্রহ্মপুত্রের জলে স্নান করলে পাপ মোচন হয়। স্নানের পর আমি গভীর শান্তি অনুভব করি এবং ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করি।”
চিলমারীর স্থানীয় বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী নগেন্দ্র নাথ বর্মন বলেন, “বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে গঙ্গার পবিত্র জল আধ্যাত্মিকভাবে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়। এই মিলনে স্নান করলে পাপমোচন ও মানসিক শান্তি লাভ হয়।”
পুরোহিত কানাই চক্রবর্তী জানান, এ বছর প্রায় তিন শতাধিক পুরোহিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ভক্তরা পূজা-অর্চনা ও পিণ্ডদান করেন। তিনি বলেন, “ভক্তিভরে প্রার্থনা করলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন এবং পুণ্য অর্জন হয়।”
চিলমারী উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সচীন্দ্র নাথ বর্মন জানান, প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ ভক্ত এই উৎসবে অংশ নেন এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অনেক তীর্থযাত্রী আগের দিনই এসে নদীতীরে অবস্থান নেন এবং ভোরে পুণ্য স্নান সম্পন্ন করেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন ছিল সতর্ক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ, নৌ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যদের পাশাপাশি ২০০-র বেশি স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, “প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে উৎসবটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”