আতাউর রহমান বিপ্লব, কুড়িগ্রাম: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৬:৫১ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি অতি পুরোনো ও বড় গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় টেন্ডার ও বিক্রয় কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেদার ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান কবিরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
গাছের নিলাম–ক্রয়কারী হিসেবে দেখানো মাহাবুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান কবির সরলতার সুযোগ নিয়ে তার নাম ব্যবহার করে নিজেই গাছগুলো নিলামে কিনে নেন। নিলাম প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না বলে দাবি করে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন সংস্কারের অজুহাতে স্কুল চত্বরে থাকা প্রায় ৭০ বছর বয়সী ৩টি মেহগুনি, ২টি রেইন্ট্রি কড়াই ও ২টি অর্জুন গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২৬ নভেম্বর ২০২৫ সালে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আদেশে চার সদস্যের একটি টেন্ডার ও বিক্রয় কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান কবির। অন্য সদস্যরা হলেন— ইউএনওর প্রতিনিধি উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা, উপজেলা পরিবেশ ও বন কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান শাহিন এবং বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোখলেসুর রহমান।
অভিযোগ রয়েছে, কমিটির সদস্যরা বিধি অমান্য করে গোপনে দরপত্র আহ্বান করেন এবং নাগেশ্বরী পল্লী উন্নয়ন অফিসে বৈঠকের মাধ্যমে কাগজে-কলমে গাছের বাজার মূল্য নির্ধারণ করে মাহাবুর রহমানের নামে মাত্র ৯৯ হাজার ৯৭২ টাকায় ৭টি গাছ বিক্রি সম্পন্ন করেন। অথচ এসব গাছের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার পর প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান কবির একটি মেহগুনি গাছের তিনটি খণ্ড স্থানীয় ব্যবসায়ী জাকিরুল ইসলামের কাছে ৫০ হাজার টাকা, বিশ্বজিৎ মাস্টারের কাছে ৭ হাজার টাকা এবং বাবু নামে এক ব্যক্তির কাছে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। অবশিষ্ট গাছের অংশ নিজ গ্রামের বাড়ি পূর্ব খামারে নিয়ে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ স’মিল মালিক হামিদুল ইসলামের মাধ্যমে আসবাবপত্র তৈরির কাজ করেন।
নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ বিদ্যালয়ের গাছ টেন্ডার বা নিলাম সংক্রান্ত নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে—
প্রতিষ্ঠান প্রধানের আবেদনের ভিত্তিতে পরিচালনা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বন বিভাগের মূল্যায়ন, প্রকাশ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি এবং বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগার বা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাছ না কাটার নির্দেশনাও জারি রেখেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নীতিমালা উপেক্ষা করে টেন্ডার কমিটির চার সদস্য গোপনে নিলাম সম্পন্ন করে অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া স্থানীয় রবিউল আলম, আনোয়ার হোসেন ও আব্দুস সালাম বলেন,“৭০ বছরের পুরোনো ৭টি গাছের মূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা হলেও সেগুলো গোপনে নামমাত্র দামে বিক্রি করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার চাই।”
অন্যদিকে আতাউর রহমান, ওমর ফারুক, মাহিমুল ইসলাম মজনু, রবিউল ইসলাম ও হানিফ উদ্দিন বলেন,
“প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান কবির প্রভাব খাটিয়ে স্কুলের গাছ কেটে নিজের স্বার্থ হাসিল করছেন। এতে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে।”
অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান কবির বলেন,“কাগজপত্র ঠিক রেখেই গাছ নিলামে বিক্রি করা হয়েছে”— বলে ফোন কেটে দেন।
উপজেলা পরিবেশ ও বন কর্মকর্তা মো. সাদিকুর রহমান শাহিন জানান,“ইউএনওর নির্দেশে গঠিত কমিটির মাধ্যমে গাছ নিলামে বিক্রি হয়েছে।”
ইউএনওর প্রতিনিধি উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন,“প্রধান শিক্ষকের অনুরোধে প্রকাশ্যে টেন্ডার হয়নি। গাছ নিলামের কাগজপত্র প্রধান শিক্ষকের কাছেই রয়েছে।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন,“আমি টেন্ডার কমিটিতে ছিলাম না। কোনো কাগজপত্রও আমার কাছে নেই।”
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন,“অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”





