স্টাফ রিপোর্টার: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:২০ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
নদীভাঙন আর বন্যার নির্মম থাবায় সর্বস্ব হারিয়েও চিলমারীর চরাঞ্চলের কৃষকরা হার মানেননি। যেখানে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নেই, সেখানে ধূ-ধূ বালুচরেই তারা ঘাম ঝরিয়ে বুনছেন বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নদী কেড়ে নিয়েছে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি, আর কৃষকের কাঁধে চাপিয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
চিলমারী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন শতভাগ চরাঞ্চল এবং আরও দুটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা চর। বহ্মপুত্র নদের ভয়াল ভাঙনে প্রতি বছর শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আজও নেই কোনো স্থায়ী সমাধান , নেই কার্যকর পুনর্বাসন।
নয়ারহাট ইউনিয়নের কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন,“আমার সব ধানিজমি নদীর পেটে চলে গেছে। এখন চর জেগেছে, তাই বাধ্য হয়ে বালুচরে ভুট্টা চাষ করছি।”
একই এলাকার রহমত আলী বলেন,“১০ বিঘার মধ্যে ৯ বিঘাই নদীতে বিলীন। এখন ১ বিঘা আছে—তাও চর। নিজের টাকায় বীজ ও সার কিনে ভুট্টা করছি। সরকারের কোনো সহায়তা নেই।”
অষ্টমীরচর ইউনিয়নের কৃষক সাইদুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম বলেন,“বন্যার পর জমিতে শুধু বালু। তবুও সেই বালুতেই ভুট্টা লাগিয়েছি। এখন পর্যন্ত ফসল ভালো আছে।”
মোনতোলা চরের কৃষক সাজু মিয়া ক্ষোভে বলেন,“পাঁচ বছর আগে নদী আমার বসতভিটা আর আবাদি জমি গিলে খেয়েছে। আমি আজ ভূমিহীন, সর্বস্বান্ত। গত বছর যখন আবার চর জেগে উঠল, তখন সেই বালুর ওপরই শেষ ভরসা রেখে ভুট্টা চাষ করেছি। কিন্তু সরকার আমাদের কোনো সহায়তা দেয় না। সার, বীজ সব কিনতে হয় আগুন দামে। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ—কিন্তু আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। কৃষকেরা সবসময় অবহেলিত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত।”
চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতী গ্রামের এক কৃষক বলেন—
“আমি ৩০ একর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু লড়াই করার শক্তি কেড়ে নিতে পারেনি।”
লাভ আছে, কিন্তু ঝুঁকি আরও বেশি
১ একরে খরচ: প্রায় ৭০,০০০ টাকা
উৎপাদন: প্রায় ১২০ মন
বাজার মূল্য: প্রায় ১,৩০,০০০ টাকা
নিট লাভ: প্রায় ৬০,০০০ টাকা
চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন,
“গত বছর ভুট্টার ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় এবার কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। চলতি মৌসুমে চিলমারীতে প্রায় ২ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
কৃষিবিদ মাসুদ আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“চরাঞ্চলের বালুময় জমি কোনোভাবেই সাধারণ কৃষির জন্য উপযোগী নয়। তবুও জীবন বাঁচাতে কৃষকেরা সেখানে ভুট্টা ফলাচ্ছে। ভুট্টা টিকে যায় বলে কৃষক টিকে থাকে, সরকার নয়। যদি এখনই মানসম্মত বীজ, ভর্তুকিযুক্ত সার, সেচ সুবিধা ও ন্যায্য বাজার নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে এই সম্ভাবনাও ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন দায় কেউ এড়াতে পারবে না।”
চিলমারীর চরাঞ্চলের ভুট্টা চাষ এখন আর শুধু কৃষিকাজ নয়—এটি অবহেলিত মানুষের বেঁচে থাকার প্রতিরোধ। রাষ্ট্র যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তবে এই কৃষকদের স্বপ্ন আবারও নদীতে ভেসে যাবে।











