উলিপুর প্রতিনিধিঃ ৬ জানুয়ারি ২০২৬ , ৮:৫৪ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
“আগে আমাদের সংসারে খুব অভাব ছিল। ছাওয়াপোয়া নিয়ে কষ্টে দিন কাটাইছি। এখন আর অভাব নেই, শান্তিতে আছি।”—চোখে জল ধরে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের কৃষ্ণমঙ্গল গ্রামের বিধবা নারী মোছাঃ আয়শা বেগম (৫০) এই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
আয়শা বেগমের মতো তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত ও হতদরিদ্র এক হাজার নারী আজ স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। আর সেই স্বপ্নের পথপ্রদর্শক হয়েছেন উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন।
২০১৪ সালে একটি এনজিও প্রকল্পের মাধ্যমে ফরিদা ইয়াসমিন এসব অসহায় নারীকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ২০১৬ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে অনেকেই সরে গেলেও তিনি তাদের পাশে থাকেন। বরং নতুন করে ‘নারী অ্যাসোসিয়েট ফর রিভাইভাল অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ’ (নারী) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রথমদিকে অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়া চার শতাধিক নারীকে পুনর্বাসন করে মাত্র দুই থেকে ২৫ টাকা সঞ্চয়ের মাধ্যমে শুরু হয় যাত্রা। আজ সেই নারীরাই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও শ্রমিক।
বর্তমানে নিজস্ব জমিতে গড়ে ওঠা দ্বিতীয় তলা ভবনসহ প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদে। এখানে নারীরা পাটের আঁশ দিয়ে হাতে তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব পাপোশ, টেবিলম্যাট, শিকা, মেকআপ ব্যাগ, ফেব্রিক ব্যাগ, ঝুড়ি, টেবিল রানার ও শোপিসসহ নানা ঘর সাজানোর সামগ্রী। এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার পণ্য বিদেশে রপ্তানি হলেও দেশীয় বাজার না থাকায় উৎপাদন সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
উলিপুর পৌরসভার রামদাস ধনিরাম এলাকায় অবস্থিত কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে কর্মচাঞ্চল্য মুখর পরিবেশ। শ্রমিক মোছাঃ আফরোজা বেগম, মৌসুমী বেওয়া, সালমা বেগম, বেবী আক্তারসহ অনেকেই জানান, শুরুতে মাসে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হলেও এখন তারা পাচ্ছেন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার নারী বাড়িতে বসেই অর্ডার নিয়ে কাজ করছেন।
শ্রমিক মোছাঃ মমিনা বেগম বলেন, “আগে সমাজে আমাদের অবহেলা করা হতো। এখন সবাই সম্মান করে।” এখান থেকে কাজ শিখে অনেকেই নিজ উদ্যোগে উদ্যোক্তা হয়েছেন। উদ্যোক্তা মোছাঃ নুরিমা বেগম ও মোছাঃ লাভলী বেগম বলেন, “নিজের অভাব ঘুচিয়ে এখন অন্য নারীদের আলোর পথে আনছি।”
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন জানান, “একটি সেলাই মেশিন দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে ১০টি সেলাই মেশিন ও ৫০টি তাঁত রয়েছে। দেশীয় ক্রেতা না থাকায় আপাতত তাঁতের কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বল্প সুদে ঋণ পেলে হাজারো নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।”
কুড়িগ্রাম বিসিকের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, “‘নারী’ একটি সফল ও উৎপাদনমুখী হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান। আমরা সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।”
উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, “‘নারী’ সংস্থা পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য উৎপাদনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।”
অসহায় নারীদের জন্য ‘নারী’ আজ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি তাদের আত্মমর্যাদা, স্বপ্ন ও নতুন জীবনের ঠিকানা।





