আতাউর রহমান বিপ্লব, কুড়িগ্রাম: ৬ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:৪৯ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ৭ জানুয়ারি। সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয় কিশোরী ফেলানী খাতুন। হত্যার পর দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলে ছিল তার নিথর দেহ। এ ঘটনায় গণমাধ্যমসহ বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত।
পরবর্তীতে বিএসএফের বিশেষ আদালতে দুই দফা বিচারে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহযোগিতায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে ফেলানীর পরিবার। তবে ১৪ বছর পার হয়ে ১৫ বছরে পা দিলেও এখনো ফেলানী হত্যার বিচার পায়নি তার পরিবার।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। তার বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ের উদ্দেশে দেশে ফেরার সময় ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোর ৬টার দিকে ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে মই বেয়ে কাঁটাতার পার হওয়ার চেষ্টা করে ফেলানী। এ সময় বিএসএফের গুলিতে সে আহত হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ছটফট করার পর নির্মমভাবে মৃত্যু হয় ফেলানীর। পরে সকাল পৌনে ৭টা থেকে তার নিথর দেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা।
ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করলে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। ওই আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মামা হানিফ। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ আদালত। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের দাবি জানান ফেলানীর বাবা।
২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে সাক্ষ্য দেন নূরুল ইসলাম। ২০১৫ সালের ২ জুলাই আদালত পুনরায় অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। রায়ের পর একই বছরের ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। ওই বছরের ৬ অক্টোবর রিটের শুনানি শুরু হয়। ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকলেও করোনার কারণে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। রিট মামলার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কেও কোনো খবর নেই ফেলানীর পরিবারের কাছে।
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আমার মেয়েকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে। দুই দেশের মাটিতে কত রক্ত ঝরেছে। ১৫ বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার পেলাম না। বিচারের অপেক্ষায় আছি।”
মেয়ের হত্যার বিচার না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, “ফেলানী হত্যার ১৪ বছর পেরিয়ে ১৫ বছরে পড়লেও বিচার পেলাম না। সুপ্রিম কোর্টে মামলা নিয়েছি, কয়েকবার শুনানির তারিখ পড়লেও তা পিছিয়ে গেছে। এখন আর কোনো খবর পাই না। আমার মেয়ের বিচার হলে সীমান্তে আর মানুষ মরত না। সরকারের কাছে দাবি জানাই—মরার আগে যেন বিচার দেখে যেতে পারি।”
রিট পিটিশনের পাশাপাশি ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলামকে প্রথম এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলীকে দ্বিতীয় বাদী করে ভারতের আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয় (ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া)-এর সচিব ও বিএসএফের মহাপরিচালককে বিবাদী করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নয়াদিল্লিতে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের ২১ জুলাই অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণের দাবিতে আরও একটি আবেদন করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী মুঠোফোনে জানান, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে।
কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, “ভারতের আন্তরিকতার অভাবে ফেলানী হত্যার বিচার হচ্ছে না। বিচার হলে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড কমে আসত। ভারতের উচিত বিচার ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত নিষ্পত্তি করা।”











