রাজনীতি

চরাঞ্চলে গণভোট অচেনা:জীবনের লড়াইয়ে হারিয়ে গেছে ‘হ্যাঁ-না’ভোট

  স্টাফ রিপোর্টার: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও খুব কম ব্যবহৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র পরিচালনা, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার বৈধতা অর্জনের প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রতিটি গণভোটই সাধারণ মানুষের জীবনে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি আস্থা গণভোট। পরে ১৯৮৫ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতার বৈধতা দিতে সামরিক শাসনের গণভোট আয়োজন করেন, যা রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। অন্যদিকে ১৯৯১ সালের সাংবিধানিক গণভোট ছিল ঐতিহাসিক ও তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য; এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরে আসে।
এর ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট নেওয়া হবে—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, ৩০টি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধনী।
তবে অতীতের গণভোটগুলোর তুলনায় এবারের গণভোট সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে জটিল ও অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে—বিশেষ করে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত এলাকায়।
ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ ৪৫০টি চরে বসবাসকারী হাজারো মানুষের কাছে আসন্ন ‘হ্যাঁ-না’ গণভোট এখনো অচেনা বিষয়। দৈনন্দিন জীবনের কঠিন সংগ্রামে ব্যস্ত এসব মানুষের কাছে গণভোটের চারটি প্রশ্ন কেবল দূরের কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। কিন্তু চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জানেন না, গণভোটে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে কিংবা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট কীভাবে দিতে হবে।

চিলমারী, রৌমারী, উলিপুর ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, শহর ও উপজেলা সদরে যেখানে পোস্টার, মাইকিং ও সভা-সমাবেশ চলছে, সেখানে চরাঞ্চলে কার্যকর কোনো প্রচার চোখে পড়ছে না। অনেক ভোটার জানিয়েছেন, আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কেউ তাদের এলাকায় এসে গণভোট বিষয়ে আলোচনা করেননি।
চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের দুর্গম গয়নারপটোল চরের কৃষক আবু সহিদ বলেন,
“আমরা শুধু ধানের কাজ আর নদীর চিন্তায় থাকি। ভোট মানে নৌকা, ধান বা দাঁড়িপাল্লা প্রতীক। হ্যাঁ-না ভোট কী—কেউ বোঝায়নি।”
রৌমারীর চর ফুলমারী গ্রামের জেলে রফিকুল ইসলাম জানান,“ভোট দিতে গেলে মার্কা দেখেই বুঝতাম। কাগজে লেখা হ্যাঁ-না থাকলে বুঝবো কীভাবে? দুইটা ব্যালটের কথাও আজ প্রথম শুনছি।”

চিলমারী উপজেলার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা সুরমান আলী (৫৫) বলেন,“আমরা নদীর চরে থাকি, দিন আনি দিন খাই। ভোট মানে প্রতীক দেখে সিল মারা। হ্যাঁ-না ভোট কী, কেন দিতে হবে—কেউ কোনোদিন বুঝিয়ে বলেনি।”

চরাঞ্চলের মানুষের জীবন নদীভাঙন, বন্যা, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ভোটার শিক্ষা বা রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ে আলোচনা তাদের কাছে অনেক সময় বিলাসী বিষয় বলেই মনে হয়।
উলিপুর উপজেলার চর বোয়ালমারী গ্রামের নারী ভোটার রেহানা বেগম বলেন,“ভাঙনে ঘর গেছে, এখন আবার ভোট। সংসদে যাকে পাঠাবো সেটাই বুঝি। হ্যাঁ-না ভোট দিলে কী হবে—এটা কেউ বলেনি।”

সচেতন মহলের মতে, চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত ও সহজবোধ্য প্রচার না হলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। অনেক ভোটার হয়তো শুধু সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে ভোট দেবেন, গণভোটের ব্যালট ফাঁকা রেখে চলে আসবেন—যা গণভোটের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
স্থানীয় এনজিও কর্মী সাহেরা খাতুন বলেন,
“গণভোট বিষয়টি নতুন হওয়ায় দুর্গম এলাকায় এই হ্যাঁ না ভোটের প্রচার আরও জোরদার করা দরকার ছিল।

শিক্ষাবিদ তাহমিনা আকতার বলেন, চরাঞ্চলের জন্য আলাদা পরিকল্পনা জরুরি। নৌকাভিত্তিক প্রচার, স্থানীয় ভাষায় লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সচেতনতা সভা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া গণভোট সফল করা কঠিন হবে।
নারী নেত্রী রোকেয়া ইসলাম বলেন,
“চরাঞ্চলের মানুষকে বাদ দিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সফল হতে পারে না। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গণভোট কার্যত শহরমুখী হয়ে পড়বে।”

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষ বরাবরই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রান্তে থেকেছেন। এবারও যদি ‘হ্যাঁ-না’ গণভোট তাদের কাছে অচেনাই থেকে যায়, তবে গণভোটের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে—চরাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘আমি যেখানে যাচ্ছি গণভোটের বিষয়ে অবগত করছি। এ বিষয়ে জেলা তথ্য অফিস থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে প্রেস মিটিং করেছি। সামনে আরো ব্যাপকভাবে গণভোটের প্রচারণা চালানো হবে।’